আলাদা লিঙ্গের স্বীকৃতি পাচ্ছেন হিজড়ারা

দেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীকে এখন আর নারী বা পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিতে হবে না। তাঁরা নিজেদের ‘হিজড়া’ হিসেবেই পরিচয় দেবেন।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ সভায় নারী-পুরুষের পাশাপাশি হিজড়াদের আলাদা লিঙ্গ বা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সেক্স ওয়ার্কার্স নেটওয়ার্ক ও হিজড়াদের নিয়ে কর্মরত সংগঠন সম্পর্কের নয়া সেতুর প্রেসিডেন্ট জয়া শিকদার বলেন, ‘রাষ্ট্রের কাছ থেকে এ ধরনের স্বীকৃতি পাওয়া অনেক বড় ব্যাপার। এখন সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে আমাদের স্বীকৃতি আদায় করতে হবে। আমাদের সম্পর্কে সমাজের নেতিবাচক মনোভাব পাল্টাতে হবে।’
জয়া শিকদার জানান, দেশের সংবিধান অনুযায়ী হিজড়াদের প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। হিজড়া সম্প্রদায় তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। পরিবারে তারা অবহেলিত। লেখাপড়া ও কাজের সুযোগও তারা পায় না।
পাসপোর্ট করতে গেলে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে নারী বা পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিতে হতো। পাসপোর্টের ফরমে ‘নারী’, ‘পুরুষ’ ও ‘অন্যান্য’ এভাবে লেখা থাকলেও ‘অন্যান্য’ ঘরটির সেভাবে বাস্তবায়ন ছিল না। এখন স্বীকৃতির ফলে এ ধরনের সমস্যা থাকবে না বলেই মনে করছে হিজড়া জনগোষ্ঠী।
দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে সঠিক তথ্য নেই। তবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তর ২০১২ সালে এক জরিপে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নয় হাজার ২৮৫ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হিজড়া জনগোষ্ঠীর এইচআইভি বা এইডস নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। একই সময়ে এই সংস্থার করা হিসাবও বলছে, সংখ্যাটি মোটামুটি নয় হাজারের কাছাকাছি।
বর্তমান সরকার প্রথমবারের মতো হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ৭২ লাখ ১৭ হাজার টাকায় একটি পাইলট প্রকল্পের অধীনে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সাতটি জেলায় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার বরাদ্দ দিয়েছে চার কোটি ৩৩ লাখ দুই হাজার টাকা। কর্মসূচিটি ২১টি জেলায় বাস্তবায়িত হবে।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির সমন্বয়ক নূরুন নাহার বেগম প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, সরকারি স্বীকৃতি হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। পাইলট কর্মসূচির অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক কারণে হিজড়া সন্তানের পরিচিতি লুকিয়ে রাখার প্রবণতায় প্রাথমিক স্তরে উপবৃত্তি দিতে চাইলেও সবার কাছে তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বর্তমান কর্মসূচির আওতায়ও পঞ্চাশোর্ধ্বদের ভাতা, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি এবং বিভিন্ন স্তরে কর্মক্ষম হিজড়া জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
এর আগে ২০১১ সালে হিজড়াদের সমাজের মূলস্রোতে আনার উদ্দেশ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের টিম-ই, ব্যাচ ৩২, ম্যাট ২-এর অধীনে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে ২০ জন হিজড়া জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ‘ইন্টিগ্রেশন অব ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি ইনটু মেইনট্রিম সোসাইটি’ শীর্ষক এ কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প।
এ প্রকল্পের দলনেতা সরকারের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা (বর্তমানে লিয়েনে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে কর্মরত) এস এম এবাদুর রহমান প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে সমাজের মূলধারায় অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে হিজড়াদের সম্পর্কে সমাজের নেতিবাচক মনোভাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কম টাকা দিতে চাওয়ার কারণে অনেকেই শেষ পর্যন্ত চাকরিতে টিকে থাকতে পারেননি। তাই স্বীকৃতির পাশাপাশি সমাজের মনোভাবও পাল্টাতে হবে।
হিজড়াদের নিয়ে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহমেদ বলেন, সরকারের উচিত আদিবাসী বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মতো হিজড়াদের জন্যও শিক্ষা, চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোটা চালু করা।
Share on Google Plus

About Unknown

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.
    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment